মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

পুরাকীর্তির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা

চাঁদপুরের ঐতিহাসিক নিদর্শন

 

চাঁদপুর -এর কচুয়া, হাজীগঞ্জ উপজেলার কিছু অংশ ও শাহরাস্তি উপজেলার মেহের শ্রীপুর অঞ্চলটি সবচেয়ে প্রাচীন। বাংলার সুলতান ফখরউদ্দিন মুবারক শাহ্ এর রাজত্বকালে (১৩৩৮-১৩৪৯) দেওয়ান ফিরুজ খান লস্কর এর খনন করা দীঘির পশ্চিম পাড়ে ৭৭৫ হিজরীতে একটি মসজিদ স্থাপন করা হয়। এ মসজিদই সম্ভবত বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার সর্ব প্রাচীন মসজিদ। এটি হাজীগঞ্জ উপজেলার সামান্য উত্তরে পিরোজপুর গ্রামে অবস্থিত। চাঁদপুর জেলার ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হাজীগঞ্জ এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। হাজী মনিরুদ্দিন শাহ (মনাই গাজী) এর হাজী দোকান এর সুখ্যাতিতে গড়ে উঠা বাজার থেকে হাজীগঞ্জ শব্দের উৎপত্তি ঘটে। জেলার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্যতম বড় মসজিদ হাজীগঞ্জে অবস্থিত। ঐতিহাসিক এই বড় মসজিদ স্থাপিত হয় ১৩০০ বঙ্গাব্দে (১৮৯৩ খ্রি.)। হাজীগঞ্জের ৬ মাইল পশ্চিমে অলিপুর গ্রাম। এ গ্রামে দুটি প্রাচীন মসজিদ আছে। একটি শাহ সুজার আমলে নির্মিত সুজা মসজিদ। অপরটি মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে নির্মিত আলমগীর মসজিদ নামে পরিচিত। এটি নির্মাণ করেছিলেন মোঃ আবদুল্লাহ আনুমানিক ১৩৭০ খ্রি.। আলীগঞ্জের মাদা্হ খাঁ নামক এক দরবেশের নামে ১৭৩৮ খ্রি. স্থাপিত হয় বর্তমান মাদা্হ খাঁ মসজিদ।

 

১৩৫১ সালে মেহের শ্রীপুর অঞ্চলে এসেছিলেন বিখ্যাত আউলিয়া হযরত রাস্তি শাহ। ১৩৮৮ খ্রি. তিনি ইন্তেকাল করেন। মেহের শ্রীপুর-এ তাঁর মাজার অবস্থিত। বিখ্যাত হিন্দু সাধক সর্বানন্দ ঠাকুর এ মেহেরেই দশ মহাবিদ্যা সিদ্ধি লাভ করেছিলেন। সিদ্ধি লাভের স্থানটিতেই গড়ে উঠেছে মেহের কালবাড়ী। হযরত রাস্তি শাহ্ এর নামেই এ অঞ্চলের নাম হয় শাহরাস্তি। এটিই এখন শাহরাস্তি উপজেলা নামে পরিচিত।

 

চাঁদপুর শহরের ৬ মাইল পুর্বে শাহতলী গ্রামটি বাগদাদ থেকে আগত দরবেশ শাহ মোহাম্মদ সাহেবের নাম থেকে হয়েছে। তিনি সুলতান ফিরোজ শাহের রাজত্বকালে ধর্ম প্রচারের জন্য এ অঞ্চলে এসেছিলেন। তিনি সুলতানের নিকট থেকে নিস্কর জমি লাভ করেছিলেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে চাঁদপুর মহকুমার প্রথম মঠ স্থাপিত হয়েছিল বাবুরহাটের কাছে বর্তমান মঠখোলায়। বাবুর হাট তখনও স্থাপিত হয়নি।

 

নাসিরকোট গ্রামটি হাজীগঞ্জ উপজেলা সদর হতে প্রায় ১০ মাইল উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার সময় কচুয়া থানার আলীয়ারায় ক্ষত্রীয় রাজা অযোধ্যারাম ছেদ্দা নিজেকে স্বাধীন নরপতি হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা তাকে দমনের জন্য সেনাপতি নাসির খানকে প্রেরণ করেন। নাসির খান এখানে একটি দূর্গ নির্মাণ করেন। যুদ্ধে ছেদ্দা পরাজিত ও নিহত হন। কোট অর্থ দূর্গ। তাই নাসির খানের দূর্গের জন্যই এই গ্রামের নাম হয় নাসিরকোট।

 

১৮৮২ সালে ঢাকা নবাবদের দানে প্রতিষ্ঠিত হয় চাঁদপুর শহরের প্রথম মসজিদ বেগম মসজিদ। হাজীগঞ্জের লক্ষী নারায়ণ জিউর আখড়া স্থাপিত হয় ১৮৭৮ খ্রি.। চাঁদপুর কালীবাড়ী স্থাপিত হয় ১৮৮৩ খ্রি.। ১৮৮৫ সালে আসাম বেঙ্গল রেলপথের চাঁদপুর শাখা নির্মিত হয়। পরে আই.জি.আর.এস.এন কোম্পানীর স্টিমার ঘাট স্থাপিত হয়। বাণিজ্যকেন্দ্র হিসাবে সারা ভারতে চাঁদপুরের পরিচিতি ছিল। এটি তখন ছিল পাট ব্যবসায়ের অন্যতম কেন্দ্র। চাঁদপুরকে এক সময় বৃটিশ ভারতের গেটওয়ে টু ইস্টার্ণ ইন্ডিয়া বলা হতো। চাঁদপুর জেলার চালিতাতলীর এডওয়ার্ড ইনস্টিটিউট এ জেলার সর্ব প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

 

জি.পি ওয়াইজ মেঘনা তীরবর্তী শ্রীরামদী- ব্রাক্ষণচর, নাছিমপুর, ভড়ঙ্গারচর এবং আকানগর নামক স্থানগুলোতে কুঠি স্থাপন করে নীল চাষ শুরু করেছিলেন। ১৮৬৬ সনে এই নীল চাষের পূর্ণ উন্নতি সাধিত হয়েছিল। কিন্তু নীল চাষীদের দূর্বার প্রতিরোধের মুখে ১৮৭৩ সালে এ অঞ্চল থেকে নীল চাষ বন্ধ হয়ে যায়। বেশীর ভাগ নীল কুঠি এখন মেঘনা গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তবে ফরিদগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত সাহেবগঞ্জে এখনও কিছু নীল কুঠি আছে।

 

মতলব উপজেলার একটি গ্রামের নাম মতলবগঞ্জ। এটি বৈরাগী বাজার নামে পূর্বে পরিচিত ছিল। প্রায় ১৫০ বছর আগে কিছু বৈরাগী এ জায়গায় বসতি স্থাপন করে এবং তখন পাশ্ববর্তী এলাকার লোকজন এলাকায় আসতে শুরু করে। পরে এ জায়গা বাজার হিসেবে গড়ে উঠে এবং বৈরাগীবাজার নাম ধারণ করে। এভাবে জায়গাটিতে বাজার সৃষ্টি হয় এবং ধনাগোদা নদীর তীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর গড়ে উঠে। প্রায় ৮০/৯০ বছর আগে পাশ্ববর্তী দীঘলদি গ্রামের জনৈক মোতালেব জমাদারের নাম অনুসারে বৈরাগী বাজারকে মতলবগঞ্জ বাজার নামকরণ করা হয়। এভাবে গড়ে উঠা মতলবগঞ্জ বাজার বর্তমানে মতলব উপজেলার উপজেলা হেড কোয়াটার্স।