মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

ব্যতিক্রমধর্মী সংস্কৃতি

ধর্মীয় সংস্কৃতির একটি ব্যতিক্রমী আয়োজন

চাঁদপুরের ৪০ গ্রামে আগাম রোজা এবং ঈদ উদ্যাপন

 

প্রতিবছরই চাঁদপুর জেলার ৫ উপজেলার প্রায় ৪০টি গ্রামে আগাম রোজা এবং পবিত্র ঈদ উদযাপিত হয়। বিশ্বের যে কোনো দেশে চাঁদ দেখার উপর ভিত্তি করে এসব গ্রামে অনেক আগে থেকেই রোজা শুরু ও ঈদ পালিত হয়। চাঁদপুরের এ গ্রামগুলোতে সারাদেশের চেয়ে একদিন আগে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা রোজা রাখা শুরু করেন।

বাংলাদেশে আগাম রোজা ও ঈদ পালনের প্রবর্তক চাঁদপৃুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার সাদ্রা গ্রামের মরহুম পীর মাওলানা ইসহাক (রা.)‘র বড় ছেলে ও সাদ্রা দরবার শরীফের বর্তমান গদ্দিনশীন পীর মাওলানা আবু জোফার মোঃ আবদুল হাই বলেন, আরব বিশ্বের সাথে মিল রেখে আমরা ঈদসহ ধর্মীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদি পালন করে থাকি। তার মরহুম পিতা সেই অনেক বছর পূর্ব থেকে মধ্যপ্রাচ্য এবং চন্দ্র মাসের সঙ্গে মিল রেখে তার অনুসারিদের নিয়ে এ ভাবে ধর্মীয় উৎসবগুলো প্রচলন করেন। সেই থেকে আজও চালু আছে। 

মাওলানা আবু জোফার আরো বলেন, আগাম রোজা এবং ঈদ উদযাপনের লক্ষ্যে আমরা সবধরনের প্রস্ত্ততি নিয়ে থাকি। এ জন্য তাদের অনুসারিরা আগেভাগেই ঈদের কেনাকাটা সম্পন্ন করে। তবে চাঁদপুরের গ্রামগুলোতে আগাম ধর্মীয় উৎসব পালন নিয়ে অনুসারিদের সঙ্গে অন্যদের সঙ্গে চমৎকার একটা ভাব বিরাজ করছে। 

চাঁদপুরের যেসব গ্রামে আগাম ঈদ হবে সে গ্রামগুলো হচ্ছে, হাজীগঞ্জ উপজেলার সাদ্রা, সমেশপুর, অলীপুর, বলাখাল, মনিহার, জাক্নি, প্রতাপ পুর, বাসারা; ফরিদগঞ্জ উপজেলার ভূলাচোঁ, সোনাচোঁ, উভারামপুর, উট্তলী, মুন্সিরহাঁট, মূলপাড়া, বদরপর, আইটপাড়া, সুরঙ্গচাইল, বালিথুবা, কাইতপাড়া, নূরপুর, সাচনমেঘ, শোল্লা, হাঁসা, গোবিন্দপুর; মতলবের দশানী, মোহনপুর, পাঁচানী এবং শাহরাস্তি ও কচুয়া উপজেলার কয়েকটি গ্রাম।

 

মহিলাদের ভোট প্রদানের সংস্কৃতিতে ব্যতিক্রমধর্মী

ফরিদগঞ্জের ৫টি গ্রামের মহিলারা গত ৫০ বছর ধরে ভোট দিচ্ছেন না

 

এটি কোন ভিনদেশের গল্প নয়, আবার ফতোয়াও নয়, তবে একজন কামেল ব্যক্তির বিধিনিষেধ মেনে চলতে গিয়ে ৫টি গ্রামের মহিলারা গত ৫০ বছর ধরে কোন নির্বাচনেই ভোট দিচ্ছেন না। ভোট দিতে গিয়ে মহিলাদের বেপর্দা হবার কারণ দেখিয়ে তখনকার প্রেক্ষাপটে এমন কথা বলা হলেও দেশ স্বাধীন হবার পর আজো সেই প্রথা চলছে। চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার ১৬ নং রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের মুসলমান, হিন্দু এমনকি খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের মহিলারা এমন রেওয়াজ মেনে চলছেন।

স্বাধীনতার বেশ পূর্বে ফরিদগঞ্জের গৃদকালিন্দিয়া বাজারের পাশে ভারতের জৈনপুরের একজন কামেল ব্যক্তি বসবাস করতেন। প্রচলিত আছে, তিনি খুব আধ্যাত্বিক জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। যে কারণে আশপাশের গ্রামের মানুষের কাছে তিনি শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। জনশ্রুতি আছে, এলাকায় একবার মহামারি দেখা দেয়। এতে অনেক প্রাণহানি ঘটে। ওই বছর স্বৈরশাসক আইউব খানের নির্বাচনও চলছিল। এসময় মহিলাদের কেউ কেউ ভোট দিতে ইচ্ছাপোষণ করেন। জৈনপুরের পীর সাহেবের কাছে পরামর্শ নিতে আসেন পুরুষরা। তখন না-কি তিনি তাদের বলেছিলেন, মহিলাদের বেপর্দা করা যাবে না। আর সেই থেকে সাহেবগঞ্জ, চরমুঘুয়া, চরমান্দারি, কাউনিয়া ও মান্দাখিল এমন ৫টি গ্রামের কোন মহিলাই ভোট দিচ্ছেন না। এসব গ্রামের মধ্যে সাহেবগঞ্জে খ্রীষ্টান সম্প্রদায় বাস করছে। তা ছাড়া সবগুলো গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ও বাস করছেন। কিন্তু মুসলমান মহিলাদের মতো তারাও ভোট কেন্দ্রে যাচ্ছেন না।  

জৈনপুরের সেই পীর সাহেব বিগত ৩০ বছর আগে ভারতে চলে যান। তিনি সেখানেই ইন্তেকাল করেন। কিন্তু তার সেই বিধি নিষেধ এই স্বাধীনদেশে আজো মেনে চলছেন এলাকার মহিলারা। এমন কথাই বলছেন সবাই। তবে এদের কেউ কেউ ভোট দিয়েছেন। আবার কেউ প্রথা ভাঙতে চান। বেশ কয়েকজন মহিলারা প্রার্থীও হয়েছেন। তবে এ নিয়ে ইসলামী চিন্তাবিদ ও সরকারি কর্মকর্তারা আশার কথা বলেছেন। এ ব্যাপারে দেশের বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, ফরিদগঞ্জ কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ড. একেএম মাহবুবুর রহমান বলেন, ইসলাম গনতন্ত্রে বিশ্বাসী। তাই এ ধর্মে নারী-পুরুষ সবাইকে ভোটাধিকার নিশ্চিত করেছে। যদি কেউ ভোট না দেন, তা হলে খারাপ লোক নির্বাচিত হয়ে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাকে পরকালে জবাবদিহি করতে হবে। চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক প্রিয়তোষ সাহা বলেন, রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের মহিলাদের ভোট না দেওয়া একটি কুসংস্কার। সরকারি প্রশাসন থেকে মহিলাদের ভোট কেন্দ্রে আসতে আমরা উৎসাহ যোগাচ্ছি। ইতিমধ্যে বেশ কিছু উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক আশা করেন, এমন কুসংস্কার ভেঙে সব নির্বাচনে মহিলারা ভোট দেবেন। 

নির্বাচন অফিস সূত্রে জানাগেছে, বিগত উপজেলা নির্বাচনে সেখানে মাত্র ৩০ শতাংশ ভোট পড়েছিল। অথচ ভোটার তালিকায় পুরুষের চেয়ে মহিলা ভোটারের সংখ্যা বেশি। এদিকে, ২০১১ সালে ইউপি নির্বাচনের আগে মহিলা ভোটারদের ভোট দানে উৎসাহিত করতে প্রশাসন গৃদকালিন্দিয়া হাজেরা-হাসমত কলেজে একটি সভা করে। এসময় সেখানে উপস্থিত একদল যুবক চিৎকার করে বলতে থাকে মহিলা ভোট দিতে না। হুজুরের নিষেধ আছে। প্রশাসন তাদের বুঝিয়ে শান্ত করে। কেউ কেউ ভোট দেবার প্রতিশ্রুত দেন। কিন্তু ভোটের দিন শেষ পর্যন্ত কোন মহিলাই ভোট কেন্দ্রে যাননি।